গণপূর্ত ও এলএ শাখার সম্পৃক্ততায় তাঁতপল্লী নির্মাণে কোটি টাকার অনিয়ম

0
32

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
দফায় দফায় হাজারো ঘর বাড়ি স্থাপনা উচ্ছেদের পরও বহুল প্রত্যাশিত আলোচিত শেখ হাসিনা তাত পল্লীতে আবারো কোটি টাকার দূর্নিতীর অভিযোগ উঠেছে। মাদারীপুর গনপূর্ত বিভাগ ও ভূমি অধিগ্রহন বিভাগের যোগ সাজশে এ দূর্নিতী হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।গুরুতর এ অভিযোগটি অবগত হয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশক্রমে প্রকল্প এলাকার উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে অভিযোগের প্রমানও মিলেছে। ক্ষতিপূরনের তালিকায় উঠা বেশ কিছু বসত ঘরে নেই দরজা-জানালা, নেই বিদ্যুৎ সংযোগও। এমনকি ঘরে থাকেন না কেউ। অথচ, এসব স্থাপনাকে পুরনো স্থাপনা ও বসতঘর দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেখিয়ে তালিকা প্রস্তুত করেছে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা ও গণপূর্ত বিভাগ। অভিযোগ আছে, মাদারীপুরের শিবচরের শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী নির্মানে জমি অধিগ্রহনের কার্যক্রম গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা দালালদের সাথে হাত মিলিয়ে একটি সিন্ডিকেট চক্র এসব তালিকা প্রস্তুত করেছেন।
সরেজমিন একাধিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ’শেখ হাসিনা তাত পল্লী’র ভিত্তিপ্রস্তর করেন। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ শ ১১ কোটি টাকা। প্রকল্পটির জন্য জেলার শিবচর উপজেলার কুতুবপুরে ৬০ একর ও শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় ৪৮ একর জায়গা নির্ধারন করা হয়েছে । এ প্রকল্পে অসংখ্য ৬ তলা বিশিষ্ট ভবনে প্রত্যেক তাতীর জন্য ৬ শ ফুটের কারখানা ও ৮ শ ফুটের মধ্যে আবাসন সুবিধা থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে সুতা রংসহ কাচামালের সুবিধা দেয়া হবে। নির্মান হবে আন্তঃজার্তিক মানের শোরুম। প্রশিক্ষন কেন্দ্র। তাতীদের ছেলে মেয়েদের জন্য থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রধানমন্ত্রীর ভিত্তিপ্রস্তরের পর ওই জমির মালিক ও এক শ্রেনীর দালাল চক্র প্রকল্প এলাকায় সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে শত শত ঘরসহ স্থাপনা নির্মান ও গাছ লাগানো শুরু করে। এনিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন কওে অপতৎপরতা দেখে উভয় জেলা উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর গত ২৭ জানুয়ারি ৭২ ঘন্টার সময় বেধে দিয়ে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে মাইকিং করে প্রশাসন। এরপরপরই শিবচরের কুতুবপুর উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে প্রথম দিনেই ৮০ টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রশাসন। ৩১ জানুয়ারি তাত বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সাদাকাতুল বাড়ির নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন কওে একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন । গত ৭ মে দুর্নিতী দমন কমিশনের ফরিদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক কমলেশ মন্ডলের নেতুর্ত্বে দুদকের একটি টিম তাঁত পল্লীর মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরা অংশ পরিদর্শন করেন।পর্যায়ক্রমে দুই উপজেলার প্রকল্প এলাকা থেকে হাজারো ঘর বাড়ি স্থাপনা উচ্ছেদ ও সরিয়ে নেয়া হয়। তুলে ফেলা হয় লক্ষাধিক গাছের চারা। রক্ষা পায় সরকারের হাজার কোটি টাকার লোপাট।
তবে স্থানীয়রা জানায়, স্থাপনা ভেঙ্গে দেয়ার পরে রাতের আধারে আবারও নির্ধারিত ওই স্থানে নির্মাণ করা হয় ঘরবাড়ি, পুকুরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লীর নির্ধারিত স্থানে চারদিকে তাকালেই দেখা যাবে এখনো খালি মাঠে বেশ কয়েকটি ছোটবড় টিসসেড ঘর। কিন্তু এসব ঘরে কেউ থাকে না। আশেপাশে কোন লোকজনও নেই। ঘরগুলো মানুষশূণ্য পড়ে আছে। এছাড়া মাছ চাষের জন্য বড় বড় সাইনবোর্ড থাকলেও পুকুরে দেখা মিলে না কোন মাছের। ওই এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে চারাগাছের একাধিক নার্সারী। এছাড়া ক্ষতিপূরনের আওতায় আসা বসত এলাকাতেও উঠানো হয়েছে নতুন নতুন স্থাপনা।
জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা ও গণপূর্ত বিভাগ জানায়, শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ৯২ নং দাগে ১টি মৌজায় শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী নির্মাণের প্রথম ধাপে ২২টি পরিবারের নাম ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা তৈরি করেন জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার সার্ভেয়ার সোহেল মিয়াজী ও মোস্তাফিজুর রহমান। পরে এই পরিবারগুলোর বিভিন্ন স্থাপনা বাবদ ৩ কোটি ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮০ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাব করেন গণপূর্ত বিভাগ। পরবর্তীতে আরো ৫টি পরিবারকে এলএ শাখা থেকে ওই কর্মকর্তারা এই তালিকায় যোগ করেন। ইতিমধ্যে এসব পরিবারকে ৭ ধারা দিয়েছে ভুমি অধিগ্রহণ শাখা। পরবর্তীতে ৮ ধারা প্রদান করলে ওইসব পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে এই ক্ষতিপূরনের পুরোটাকা উত্তোলন করতে পারবেন জেলা প্রশাসনের ভুমি অধিগ্রহন (এলএ) শাখা থেকে। ক্ষতিপূরনের এসব বিল দেয়ার প্রস্তাব দেন জেলার গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শাহরিয়ার হোসেন, মো. জোবায়ের মিথুন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাজিব আহম্মেদ তরফদার, মো. মাসুম বিল্লাহ, মো. আব্দুস সাত্তার খান।
অভিযোগ আছে, সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম করে আসছে। এক শ্রেণির দালাল, অসাধু জমির মালিকদের সাথে হাত মিলিয়ে গণপূর্ত বিভাগ এসব স্থাপনার জন্য দৃশ্যমান ঘর ও স্থাপনা দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে তালিকা প্রস্তুত করেছেন।
স্থানীয় আলমগীর হোসেন বলেন, আপনারাই দেখেন ক্ষেতের মধ্যে বড় বড় ঘর তোলা আছে কিন্তু ভিতরে কোন মানুষ থাকে না। সরকারী অফিসারগো টাকা দিয়া এলাকার লোকজন এই অবৈধ কাজ করছে। আমরা এইটার বিচার চাই আর যারা সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্থ তারা যেন দ্রুত বিল পায় তার জন্য দাবী জানাই।

স্থানীয় আলিম মিয়া বলেন, মাননীয় চীফ হুইপের কঠোর নির্দেশনার পর যেখান থেকে অবৈধ হাজার হাজার ঘরবাড়ি স্থাপনা লক্ষাধিক চারা গাছ উচ্ছেদ হলো। সরকারের সাশ্রয় হলো অন্তত হাজার কোটি টাকা টাকা। সেখানে গনপূর্ত বিভাগ, ডিসি অফিসের এলএ শাখার কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সরকারী বিল পাওয়ার জন্য কিছু দালাল শ্রেনীর লোকজন ঘর নির্মান, মাছের ঘের, বিভিন্ন গাছের বাগান করে টাকা নেয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকায় নাম উঠা দুঃখজনক। আমরা প্রশাসনের কাছে সুষ্ট তদন্ত কামনা করি যাতে অবৈধভাবে কেউ সরকারের টাকা লোপাট করতে না পারে।
কুতুবপুর ইউপি সদস্য মজিবর মিয়া বলেন, তাতপল্লী এলাকার শিবচর অংশে একটা পুরনো গ্রাম আছে। এখানে পুরনো ঘরবাড়ি আছে। লোকজন অধিগ্রহনের কথা শুনে কিছু নতুন ঘর নির্মান করেছে। ক্ষেতের মধ্যে কয়েক টা দরজা জানালা ছাড়া নতুন ঘর আছে, গাছের বাগান ও একটি পুকুরও আছে। ঘর জনশূন্যই থাকে। শুনছি এই ঘরেরও নাকি ৭ ধারা নোটিশ আসছে। অনেক পুরান ঘরের নোটিশও আসেনি। এরপরও নতুন পুরনো অধিকাংশ ঘরেরই বিলের জন্য ৭ ধারা নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আবার কারো পুরনো বসতবাড়ির বিলের নোটিশ আসেনি।
কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আতিক মাদবর বলেন, যে প্রকল্প থেকে হাজার হাজার ঘরবাড়ি স্থাপনা গাছ গাছলা উচ্ছেদ হলো। সেখানে নতুন করে দূর্নিতী মেনে নেয়া যায় না। আমরা সংশ্লিষ্ট দোষী কর্মকর্তাদের বিচার চাই।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, শিবচর ও জাজিরা দুই উপজেলার জমিতে শেখ হাসিনা তাঁত পল্লী নির্মান করা হবে। এই জমি অধিগ্রহনের খবর শুনে লোভী কিছু মানুষ সরকারের টাকা আত্মসাতের জন্য শতশত ঘর নির্মান করেছিল। মাননীয় চীফ হুইপ নূর-ই আলম চেšধুরী স্যারের নির্দেশ মোতাবেক জেলা প্রশাসনকে সাথে নিয়ে আমরা অবৈধ ঘর, স্থাপনা, গাছপালা অপসারন করেছি। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাটের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এর পরও কতিপয় অসাধু ব্যক্তিরা কিছু অবৈধ ঘর, স্থাপনা নির্মান করেছিল। যা ক্ষতিপূরনের আওতাভুক্ত হয়েছে। আমরা চীফ হুইপের স্যারের নির্দেশে আবারো তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছি। ওই অবৈধ ঘরগুলোর বিল বাবদ আর্থিক সহযোগিতা যেন না পায় তার জন্য জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি। আশা করি আর কোন অর্থলোভী দালালচক্র সরকারের টাকা লোপাটের সুযোগ পাবে না।
মাদারীপুর গণপূর্ত বিভাগ নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সালেহ মুহাম্মদ ফিরোজ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, যে সব জায়গা আমরা ক্ষতিপূরনের আওতায় আনি তা গনপূর্ত বিভাগের নির্ধারিত রেট সিডিউলের ভিত্তিতে করা হয়। জেলা প্রশাসনের চাহিদা অনুয়ায়ী প্রতিটি স্থাপনা আমরা সঠিকভাবে স্টিমেট করে থাকি। যৌথ তদন্তের ভিত্তিতে যে সকল স্থাপনা তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে আমাদের কর্মকর্তারা সরেজমিন তদন্ত করে স্টিমেট তৈরি করে। স্টিমেট তৈরিতে অনিয়মের কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এব্যাপারে সাংবাদিকদের জাতীয় সংসদের চীফ হুইফ ও মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য নুর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, ‘তাঁতপল্লী নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানে পূর্বে কোন পুরনো স্থাপনা থাকার কথা নয়। তবে পুরানো একটি গ্রাম রয়েছে। বাড়তি বিল দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে কিনা বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here